পরিবেশের ক্ষতি করে ঢাকায় অবকাঠামো প্রকল্প

আগের সরকারের দেখানো পথেই হাঁটছে অন্তর্বর্তী সরকার

রাজধানীর অন্যতম জলাধার হাতিরঝিল ও পার্ক পান্থকুঞ্জের ওপর দিয়ে নির্মাণ করা হচ্ছে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের একটি সংযোগ সড়ক (র‍্যাম্প)।

রাজধানীর অন্যতম জলাধার হাতিরঝিল ও পার্ক পান্থকুঞ্জের ওপর দিয়ে নির্মাণ করা হচ্ছে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের একটি সংযোগ সড়ক (র‍্যাম্প)। ‘পরিবেশ বিধ্বংসী’ ও ‘‌জনবিরোধী’ অ্যাখা দিয়ে এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের র‍্যাম্পটি বাতিলের দাবিতে ৩২ দিন ধরে আন্দোলন করছে ‘‌বাংলাদেশ গাছ রক্ষা আন্দোলন’ নামে একটি সংগঠন। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৩ ডিসেম্বর পার্কে গিয়ে সেখানে অবস্থানরত আন্দোলনকারীদের সঙ্গে কথা বলেন সড়ক পরিবহন উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান, পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান ও শিল্প উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান। বিষয়টি নিয়ে তারা পরে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনায় বসারও আশ্বাস দিয়ে আসেন।

এরপর ২১ দিন পার হলেও তিন উপদেষ্টা বা সরকারের দায়িত্বশীল কেউ আন্দোলনকারীদের সঙ্গে কোনো আলোচনা করেননি বলে অভিযোগ। আন্দোলনকারীরা উপদেষ্টাদের আশ্বাসকে দেখছেন ‘‌কথার বরখেলাপ’ হিসেবে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ গাছ রক্ষা আন্দোলনের সমন্বয়ক আমিরুল রাজিব বণিক বার্তাকে বলেন, ‘‌আমরা ফিডব্যাক তো পাইইনি, উল্টো আমাদের সঙ্গে বসার বিষয়ে তিন উপদেষ্টা মিলে যে কথা দিয়েছিলেন, সেটাও ‌ওনারা রক্ষা করেননি। আমাদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগও করেননি। এখন আমাদের মনে হচ্ছে, ওনারা কথার বরখেলাপ করেছেন।’

সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি) পদ্ধতিতে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েটি নির্মাণ করছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ফার্স্ট ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে। এর মালিকানায় রয়েছে চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান শ্যানডং ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিক অ্যান্ড টেকনিক্যাল কো-অপারেশন গ্রুপ ও সিনোহাইড্রো করপোরেশন। অভিযোগ রয়েছে, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের চাপেই এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের এ র‍্যাম্প বাদ দিতে পারছে না কর্তৃপক্ষ।

আর ‌এ সংযোগ সড়কের কাজ বাস্তবায়নের জন্য পান্থকুঞ্জে ৪৫ প্রজাতির দুই হাজার গাছ কেটে ফেলা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন গাছ রক্ষা আন্দোলনের সমন্বয়ক আমিরুল রাজিব। তিনি বলেন, ‘এসব এলাকা ঘনবসতি, জনঘনত্বপূর্ণ। আশপাশে কোনো খোলা জায়গা নেই। মানুষের তো আর যাওয়ার কোনো জায়গাও নেই। পান্থকুঞ্জের আকাশ বন্ধ করে দিলে তো এ এলাকার মানুষ হাঁসফাঁস করে মরবে।’

এ পরিবেশকর্মী আরো বলেন, ‘১০ বছর আন্দোলনের পর যে হাতিরঝিলকে আমরা বিজিএমইএর হাত থেকে মুক্ত করলাম, সেই হাতিরঝিলে নির্মাণ করা হচ্ছে এক্সপ্রেসওয়ের একের পর এক পিলার। হাতিরঝিল এ অঞ্চলের সর্বশেষ জলাধার। এ জলাধারটা তো খুব দরকারি। এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের র‍্যাম্প বানিয়ে এটি ধ্বংস করে ফেলা হচ্ছে। আবার কারওয়ান বাজার এলাকাটি এমনিতেই যানজটপ্রবণ। এখানে এক্সপ্রেসওয়ের র‍্যাম্প হলে বাড়তি যানবাহনের চাপ আর সামাল দিতে পারবে না। র‍্যাম্পটি পলাশী পর্যন্ত যে রাস্তা দিয়ে নিয়ে যাবে, হাতিরপুল-কাঁটাবন হয়ে ওই রাস্তারও সেই ধারণক্ষমতা নেই।’

আমিরুল রাজিব বলেন, ‘‌বাংলাদেশে অনেক কিছু পরিবর্তন হলো। বলা হচ্ছে নতুন বাংলাদেশ হবে। সবকিছু পুনর্মূল্যায়িত হবে। তো আমরা আশা করছি পুনর্মূল্যায়ন করে এ জনবিরোধী ও পরিবেশ বিধ্বংসী প্রকল্প সরকার বাদ দেবে।’

পান্থকুঞ্জ পার্কের বিষয়ে গতকাল একাধিকবার চেষ্টা করেও সড়ক উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান, পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান ও শিল্প উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খানের বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি। তবে গত ৩০ ডিসেম্বর বিষয়টি নিয়ে সড়ক উপদেষ্টা বণিক বার্তাকে বলেছিলেন, ‘পান্থকুঞ্জ নিয়ে একটা সমস্যা হয়েছে। এখন আমরা পরিকল্পনা করছি পান্থকুঞ্জ এলাকাটি গ্রিন করে দেয়ার। এছাড়া মুগদার দিকে কিছু জায়গা আছে, যেখানে পার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনা হচ্ছে। আমরা চাচ্ছি, সবুজ এলাকা, জলাধারের ক্ষতি না করেই যেন উন্নয়ন কাজগুলো করা হয়।’

শুধু ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের কারণে হাতিরঝিল ও পান্থকুঞ্জ পার্ক নয়, উত্তরা-মতিঝিল মেট্রোরেল প্রকল্পের (এমআরটি লাইন-৬) মাধ্যমে ফার্মগেটের আনোয়ারা উদ্যান দখলে নিয়েছে মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ। রাজধানী ঢাকায় বর্তমানে দুটি পাতাল মেট্রোরেলের কাজ চলমান। এর মধ্যে হেমায়েতপুর-ভাটারার মধ্যে নির্মাণাধীন এমআরটি লাইন-৫, নর্দান রুটের গতিপথে রয়েছে দুটি প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা। এই মেট্রোরেলের গতিপথ পড়েছে গুলশান-বারিধারা লেক ও তুরাগ নদে। গুলশান-বারিধারা লেক ২০০১ সালে ও তুরাগ নদকে ২০০৯ সালে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। পরিবেশবিদদের আশঙ্কা, গুলশান-বারিধারা লেক ও তুরাগ নদের নিচ দিয়ে যখন পাতাল রেল চলবে, তখন যে কম্পন হবে এবং শব্দ উৎপন্ন হবে তা এ লেকের জীববৈচিত্র্য ও জলজ বাস্তুতন্ত্রে বিরূপ প্রভাব ফেলবে।

কিছু ক্ষেত্রে অন্তর্বতী সরকার পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর প্রকল্পগুলো থেকে সরে এলেও এখনো অনেকগুলো প্রকল্প চলমান রয়েছে বলে জানিয়েছেন পরিবেশবিদ ও রিভার অ্যান্ড ডেলটা রিসার্চ সেন্টারের (আরডিআরসি) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ এজাজ। এ প্রসঙ্গে তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সরকার এখন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে যাচ্ছে না। মাতারবাড়ীকে সোলার ও এলপিজিতে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ ধরনের উদ্যোগগুলোকে আমরা সাধুবাদ জানাই। কিন্তু এখনো অনেক প্রকল্প আছে যেগুলো পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। পাশাপাশি কিছু প্রকল্পের মাধ্যমে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকেও উচ্ছেদের মতো ঘটনা ঘটছে। আর পান্থকুঞ্জ নিয়ে আমার মত হলো, ঢাকা শহরে যেহেতু উন্মুক্ত জায়গা কম, সেহেতু এ ধরনের জায়গা দখল করে কোনো অবকাঠামো হোক, তা আমরা চাই না। পান্থকুঞ্জে যারা আন্দোলন করছেন, তাদের দাবির সঙ্গে আমি সংহতি জানাই। আশা করি, সরকার বিষয়টি নিয়ে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। আর যদি পূর্ববর্তী সরকারের দায়বদ্ধতার কারণে পার্কটির ক্ষতি হয়েই যায়, তাহলে আমার দাবি থাকবে ঢাকার মধ্যেই এর দ্বিগুণ জায়গায় নতুন করে একটি পার্ক যেন গড়ে তোলা হয়।’

অন্যদিকে এখনো অন্তর্বর্তী সরকারের কাছ থেকে পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর প্রকল্পগুলো থেকে বের হয়ে আসার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না বলে মন্তব্য করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবান অ্যান্ড রিজিওনাল প্ল্যানিং (ইউআরপি) বিভাগের অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘‌বর্তমান সরকার সংস্কারের কথা বলছে। সংস্কার করতে হলে পরিবেশকেও গুরুত্ব দিতে হবে। কিন্তু আমরা হতাশার সঙ্গে দেখছি পরিবেশের বিষয়ে এখনো পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি। শুধু খাল-জলাধার দখলমুক্ত করার কথা বলে কিছু কমিটি করে দিয়েছে। কিন্তু সেই কমিটিগুলোর কাজ এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান হয়নি।’

আরও